ঈমানের সংক্ষিপ্ত পরিচয়: মুরজিয়া-খারিজি দ্বান্দ্বিকতা
ঈমানের সংক্ষিপ্ত পরিচয়: মুরজিয়া-খারিজি দ্বান্দ্বিকতা

ঈমান কি — এই মৌলিক জিজ্ঞাসাই এই দ্বান্দ্বিকতার রসদ জুগিয়েছে। অনেকে ভাবেন ঈমান বুঝি নিশ্চিত জ্ঞানের চেয়ে নিচু স্তরে, কারণ ঈমান মানেই বিশ্বাস, আর বিশ্বাস বরাবরই অন্ধ। অথচ ঈমানের অবস্থা আরো নিগূঢ় ও সূক্ষ্ম। ঈমান কেবল যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে সত্যকে (আল-হক্ব) জানা বা নিশ্চিত জ্ঞান (মারিফাত) অর্জন না, বরং ঈমান হলো সত্যের উপর হৃদয়কে (ক্বলব) সঁপে দেয়া, আরবিতে তাসদিক বিল ক্বলব।
মারিফাত, অর্থাৎ নিশ্চিত জ্ঞান, একসময়ের তাওহিদবাদী ইবলিসেরও ছিল— যেহেতু সে আল্লাহর গায়েবের বিশাল রাজত্বকে চাক্ষুষভাবে দেখেছে, তাঁকে শুনেছে।
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় ইবলিস তো আল্লাহকে রব মেনেও তাঁর অমান্য হয়েছে, ফলে রব মানার পর অমান্যতা কি কুফর?
বস্তুত, ইবলিস আল্লাহকে জানতো (মারিফাত) তবে আল্লাহকে মানতো না অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি তাঁর হৃদয়কে সে সমর্পণ করেনি। আর সেই অসমর্পিত হৃদয় প্রকাশ পেয়েছে তার বাহ্যিক কাজ ও কথা উভয়ের মাধ্যমে।
প্রশ্ন রয়ে যায়, তাহলে কি বাহ্যিক যেকোনো অমান্যতাই কুফর? কারণ ইবলিসের মতন আমরাও তো আল্লাহকে রব জেনে/মেনে তাঁর আদেশ অমান্য করি।
প্রকৃতপক্ষে, ঈমান বা কুফর যেহেতু মৌলিকভাবে হৃদয়ের বিষয় ফলে এমন বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশ যা হৃদয়ের অসমর্পিত অবস্থার জানান দেয়, সেগুলোকেই কুফর হিসেবে সাব্যস্ত করা হবে।
প্রশ্ন, কোন বহিঃপ্রকাশ হৃদয়ের অবস্থার জানান দিবে সেটা বুঝার উপায় কি? ইবলিস আর আমাদের অমান্যতার বিভেদ কি? কুফর আর কবিরা গুনাহর মাঝে সীমানির্দেশক কি?
হৃদয়ের অবস্থা যেহেতু কেবল অন্তর্যামীই জ্ঞাত, ফলে মানুষের কাছে বহিঃপ্রকাশই একমাত্র নির্দেশক। এমন কথা বা কাজ যা সহজবোধ্যভাবে স্পষ্টতই অকাট্যতার সাথে আল্লাহ কিংবা আল্লাহ থেকে উৎসারিত ঈমানের অন্যান্য মৌলিকতার অস্বীকার করার নামান্তর, তা-ই কুফর। কুফরের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা হতে পারে না, সময়ের সাথে সংজ্ঞা থেকে নতুন নিদর্শন জন্ম নিতে পারে; উদাহরণ: নবীকে গালি দেয়া, কুরআনকে অবমাননা করা ইত্যাদি কুফর নির্দেশক।
ইমাম গাযালি এবং ইমাম ইবনে আব্দুস সালামের মতে, কুফর হল এমন কিছু অস্বীকার করা যা ইসলামে সকলের কাছে অপরিহার্যভাবে পরিচিত (সূত্র ও অর্থে অকাট্য) বা এমন কোন কাজ করা যা ইসলামের প্রতি তার অন্তর্নিহিত অস্বীকৃতি বা অবজ্ঞা প্রকাশ করে। ইমাম তহাবি বলেন, বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান থেকে বিচ্যুত হয় না, যতক্ষণ না সে ঈমান আনতে যে বিষয়গুলো স্বীকারোক্তি দিয়েছে সেগুলোর কোনো একটি অস্বীকার করে।
ইবলিসের অমান্যতা ছিল আল্লাহর প্রত্যক্ষ আদেশের সামনে, যা তার হৃদয়ের অস্বীকারের স্পষ্ট প্রমাণ অর্থাৎ নামান্তর, ফলে সে আল্লাহকে তার পদস্খলনের জন্যে দায়ী করে। অথচ আদম-হাওয়া ধোঁকায় পড়ে ফল খেলেও হৃদয় সমর্পিত হওয়াতে তৎক্ষণাৎ আল্লাহর কাছে ভুলের জন্যে ক্ষমাপ্রার্থনা করে।
সুতরাং, অমান্যতা নিজেই কুফর না বরং অমান্যতার পেছনে হৃদয়ের অবস্থাই মুখ্য, ইবলিসের ক্ষেত্রে যেটা আল্লাহ তায়ালা জ্ঞাত ছিলেন এবং আমাদের জানিয়েছেন। তাই অজুহাত ছাড়া কেউ কোনো ফরজ বিধান পালন না করলে কিংবা হারাম করলে আল্লাহর বিপরীতে সে তো নিজের প্রবৃত্তিরই উপাসনা করে; তবে কি সে তাহলে নিজেই নিজের সাথে শিরক বা কুফর করলো? স্বাভাবিক অবস্থায় মোটেও না, কারণ স্পষ্টত ঈমান বা হৃদয়ের অবস্থাকে নাকচকারী (কুফরি) কথা বা কাজ ছাড়া অন্য সকল হারাম কাজে, যেমন, রমজানে রোজা না রাখা, যাকাত না দেয়া, সুদ খাওয়া, রাষ্ট্রে শরীয়া বিপরীত আইন প্রণয়ন বা তা দিয়ে শাসন করা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে স্বভাবতই কুফরের সম্ভাবনা থাকে বাস্তব (সেজন্যেই সকল হারাম কাজকেই কুফরে আসগর বলা যায়), তাই বলে হারাম কাজ করলেই কুফর হয় না।
বরং, হারাম কাজ করার পেছনে কারণ বা হৃদয়ের অবস্থা মুখ্য। এবং ব্যক্তি যদি হৃদয়ে আল্লাহকে স্বীকার করে থাকে তবে তার থেকে অতি কদাচিৎ ভুল ব্যতীত কুফর প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, কারণ কুফর ব্যক্তির হৃদয়ের অত্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান। সুতরাং হারাম কাজে লিপ্ত কেউ কুফরবশত এটা করছে কিনা জানার একমাত্র উপায় তার মৌখিক বচন, বরং সাধারণভাবে মুসলিম দাবীকারীদের ক্ষেত্রে কেবল হারাম ধরেই ইসলাহ করা হবে। তবে যদি মৌখিকভাবে জিজ্ঞাসা করা হয়, তবে এই জিজ্ঞাসা কাউকে তাকফির করার আগের জিজ্ঞাসা না, সেটা এখনো বহুদূর, বরং এটা হারাম কাজটা কুফরবশত কিনা সেটা বের করতে জিজ্ঞাসা।
স্বভাবতই, খারিজিরা ইফরাতের (বাড়াবাড়ি) বর্শবর্তী হয়ে ঈমানের স্ববিরোধী ব্যাখ্যা করেছে এবং কতিপয় হারাম কাজকে কুফর বলে আখ্যা দিয়েছে, যার দরুন হয়তো কিছু মুসলমান দাবীকারী মুরতাদের উপর তাকফিরের প্রয়োগ হচ্ছে, তবে এর পাশাপাশি প্রকৃত মুমিনদের উপরও তাকফিরের অপপ্রয়োগ হচ্ছে। এর পাশাপাশি হচ্ছে হত্যা, চেইন তাকফির, বিশৃঙ্খলা।
অন্যদিকে, মুরজিয়ারা তাফরিতের (ছাড়াছাড়ি) শিকলবন্দী হয়ে ঈমানের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে এবং কেউ মুখে স্পষ্টত মুমিন হওয়া অস্বীকার না করলে কোনোপ্রকার বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশের দ্বারা কুফর সাব্যস্ত করছে না।
আহলুস সুন্নাহর অবস্থান মধ্যখানে (ওয়াসাত)। তারা ঈমান-কুফরের সুসঙ্গত সংজ্ঞায়ন করতে পেরেছে, কথা ও কাজের কতিপয় বহিঃপ্রকাশকে কুফরের স্পষ্ট নির্দেশক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পেরেছে, এই নির্দেশক আর কবিরা গুনাহর মাঝের প্রভেদ স্পষ্টভাবে নির্ণয় করতে পেরেছে। সর্বোপরি, শতাব্দীর পর শতাব্দী কুফর ও বিদ’আতের বিপরীতে ঈমান ও সুন্নাহর আলোয় উম্মাহকে উদ্ভাসিত করেছে।
ঈমানের ভুল ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে খারিজিদের বড় একটা অংশ গড়ে উঠলেও, একাংশ তাওহিদের ভুল ব্যাখ্যা থেকে উদ্ভুত। কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো, দ্বিতীয় দল হারাম-কবিরা গুনাহ ছেড়ে স্বয়ং মুস্তাহাব কাজকেই শিরক বলে আখ্যা দিয়েছে!
বি.দ্র. ঈমানের ভুল ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা খারিজিদের বর্তমান প্রতিভাস হলো— প্রচলিতভাবে শরীয়া বিপরীত আইন প্রণয়ন বা তা দিয়ে শাসন করাকে কুফর বলা, অথচ এটা ইজমাঈভাবে ছোট কুফর বা কবিরা গুনাহ হিসেবে স্বীকৃত। তবে রাষ্ট্রীয় আইনে শরীয়ার অগ্রাধিকার আছে এমন রাষ্ট্রে শরীয়ার অগ্রাধিকারকে বাতিল করা নতুন কুফরের বাস্তব নির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যদিও সবক্ষেত্রে এটা কুফর নয়। কারণ, সাম্প্রতিক ইতিহাসে যারাই এই কাজ করেছে তাদের উদ্দেশ্য কুফরের অগ্রাধিকারেই ছিল। পাশাপাশি শরিয়াহ রাষ্ট্রে শরিয়ার প্রাইমেসি রেখে ভ্রান্ত আইন করা কেবল হারাম, আবার শরীয়াবিহীন রাষ্ট্রে তো ভ্রান্ত আইনই প্রচলিত অবস্থা। কিন্তু শরিয়াহ রাষ্ট্রে কেউ যদি শরিয়াহকেই উচ্ছেদ করে সেক্যুলার আইনব্যবস্থা প্রতিস্থাপন করে, তবে সেটা আল্লাহর প্রতি একধরণের অবজ্ঞাই প্রকাশ করে।
আর তাওহিদের ভুল ব্যাখ্যা থেকে উদ্ভুত খাওয়ারিজ দলটি রাসূল ﷺ এর নিকট ইস্তিগাসা করার মুস্তাহাব কাজকে স্পষ্টত শিরক বলে আখ্যা দিয়েছে।
메타데이터
- post_id
- 7cdd7f4e884b
- slug
- ঈমানের-সংক্ষিপ্ত-পরিচয়-মুরজিয়া-খারিজি-দ্বান্দ্বিকতা-7cdd7f4e884b
- url
- https://medium.com/@rizwanulisl/%E0%A6%88%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BF%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%A4-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%9A%E0%A7%9F-%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A6%9C%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%96%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A6%BF-%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%A4%E0%A6%BE-7cdd7f4e884b
- canonical_url
- https://medium.com/@rizwanulisl/%E0%A6%88%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BF%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%A4-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%9A%E0%A7%9F-%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A6%9C%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%96%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A6%BF-%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%A4%E0%A6%BE-7cdd7f4e884b
- author_url
- https://medium.com/@rizwanulisl
- status
- ok
- fetched_at
- 2026-08-09 13:20:20