← Back to list

মাংস সমাচার

গরুর মাংসের বিশেষত্ত হলো মাংস টা বড়ই মিশুক আর পরোপকারী।

ABID HUSSAIN · 2026-01-21 14:46 · 1 claps · 4.9 min read
#food #nostalgia #beef #slow-cooking #chattogram
Open on Medium ↗
Wiki topics: 🍳 · Food & Cooking

মাংস সমাচার

গরুর মাংসের বিশেষত্ত হলো মাংস টা বড়ই মিশুক আর পরোপকারী।

এটা এমন একটা প্রোটিন যেটার সাথে ইট, বালি, সিমেন্ট খেলেও সুস্বাদু মনে হয়।

চাটগাঁ কালচার সত্তেও গরুর মাংস জিনিসটা ছোটবেলা থেকে অনেক কম পছন্দ ছিলো।

মোল্লার দৌড় মসজিদ আর আমার দৌড় মেজবান। এর বাইরে গরু ব্যাপারটা মেনে নিতে পারতাম না প্রোটিন হিসাবে।

অনেকগুলা কারণ। যেমনঃ

১. মেজবান ছাড়া গরুর মাংস কে মূল ডিশ হিসাবে খুবই কম দেয়া হতো। পোলাও, কোরমা, রূপচাদা ফ্রাই, মুরগীর রেজালা,কাবাব আর একটা বাটীতে স্পেশাল ডিশ হিসাবে গরু। এত কিছু খেয়ে গরুটায় কখনো তৃপ্তি পেতাম না। ধারণাই ছিলো এমন যে, গরু টা খাওয়া মানেই আর নড়াচড়া করা যাবে না।

২. বিয়ে বাড়িতে গরু আর স্মর্ণ একই কথা ছিলো। ছোট একটা বাটিতে অল্প করে গরুর কিছু একটা দেয়া হতো। যেটা সবাই এক চামচ খেয়েই রেখে দিতো। পরিমাণ কমের জন্য না, জিনিসটা খেতে ভালো হতো না অন্যান্য আইটেম এর তুলনায়। তাছাড়া গরুর স্বাদ টা বড় অদ্ভুত। এটা অনেক্ষণ মুখে লেগে থাকে। তাই হয়তো সবাই অন্য খাবার টা আগেই খেয়ে নিতো। এ এক অন্যরকম ইউএক্স। কোন এক কারণে ইউজার কখনোই গরু দিয়ে শুরু করতো না। আর শেষ দানে থাকতো জর্দা অথবা পায়েস। তাই পেটে জায়গা রাখতেও অনেকে গরু থেকে বিরত থাকতো। আমি নিজেও তাদের ভেতর এর একজন।

৩. যখন কারো বাসায় যেতাম, ৭০ ভাগ মানুষের রান্নাতেই গরু একটা শক্ত খাবার ছিলো। যেটা নেয়া মানে খিলাল এর পেছনে অসংখ্য ইনভেস্টমেন্ট।

৪. মেজবানের পর কুরবানের ঈদেই একমাত্র গরু ভালো লাগতো। কিন্তু তাও বিশেষ কারো কারো রান্না। এখনো মনে আছে, এক আত্মীয়ের রান্না করা গরু দেখলে ওটা ভাঙ্গিয়ে বাড়ি বানানোর খোয়া বানাতে ইচ্ছা করতো। গ্রামের যেকোন একতলা বাড়ির খোয়া এই গোস্ত থেকে সম্ভব। অনেক বড় পিস আর শক্ত। কেন জানি মনে হতো, এর আগেও একই মাংস টাই অনেকে কামড়ে ছেড়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছে।

৫. ঢাকায় আসার পর গরু ব্যাপারটা অন্যভাবে দেখা শুরু করি। বিভিন্ন তেহারী, বিরানী তে গরু দেয় ওরা। খেতেও খারাপ না। চট্টগ্রাম এর তেহারী , বিরানীর গরুর মাংস গুলো সত্যিকার অর্থে আরেকজন এর চুষে খাওয়া মাংসের টুকরা মনে হতো। ঢাকার গুলো খারাপ না, অন্তত ওই বিচ্ছিরি বিষয়টা মাথায় আসে না।

৬. ঢাকার জীবন যাপন এ তাই গরু খাওয়ার অপেক্ষা একটাই। কলেজিয়েট এর বার্ষিক মেজবান। চট্টগ্রামের গরু কালচারেরর এটা মনে হয় একটা বেস্ট উদাহরণ, যে আমরা ইফতারেও মেজবান খাই । একটু টেকনিক্যালি খেলে অবশ্য খারাপ না , সাদা ভাত এবং প্রোটিন ই তো। যেকোন ভাজাপোড়া থেকে ভালো।

৭. এরপর আসলো নতুন ক্রেজ। সব জায়গায় শুরু হলো মেজবানী কুজিন। কিছুদিন পর্যন্ত এঞ্জয় করলাম। কিন্তু বছর খানেক এর ভেতর ই মন উঠে যাওয়া শুরু করলো। স্বাদ এও তাররম্য দেখা দেয়। আর এসমস্ত দোকানে দুটো মাংসের সাথে একটা ক্যামোফ্লজড হাড্ডী আর একটা চর্বি ফ্রী থাকে। তাই শান্তি নিয়ে খাওয়া যায় না।

অবশেষে খুঁজে পেলাম বিভিন্ন জাতের, বিভিন্ন ধরণের, বিভিন্ন স্বাদের গরু রান্না।

চমৎকার এক শেফ এর সাথে পরিচয় হলো ২০১৭ তে।

গরু নামক ঐতিহাসিক খাবারটাতে শাকসব্জি দেয়া যায় আমি জানতাম না। এক্ষেত্রে আমার দৌড় ছিলো নুডলস পর্যন্ত। তাও গতদিনের রান্না করা গরু যদি রয়ে যায় তাহলে। এমন অনেকবার হয়েছে, গতকালের গরু আছে বলেই নুডলস রান্নার প্ল্যান হয়েছে। তবে হ্যা, গ্রামে ঈদের দিন এর রান্না করা নুডলস যত সাধারণ ই হোক না কেনো, স্মৃতির পাতায় এটা আমার সবচেয়ে ইমোশনাল একটা খাবার।

যাই হোক, নতুন রেসিপি থেকে কিছু ব্যাপার দেখে আমি অবাক হলাম।

  • গরুর মাংস যে ক্রিমি হয় এবং তীব্র ঝাল ছাড়াও মজা লাগে এটা জানলাম এবং প্রচণ্ড স্বস্তিবোধ করলাম।

  • গরু মানেই যে, প্রচন্ড তেল চর্বি যুক্ত একটা খাবার এই ধারণারও অবসান হলো।

  • নতুন শেফ আমাকে মেজবানী মাংসের কিছুটা অথেন্টীক রেসিপি শেখালো আর ভিণ্ণ ধর্মী মেজবানী মাংস ও খাওয়ালো। আমি খুব ডিলেমায় পড়ে গেলাম, পুরানো প্রেম মেজবান আর নতুন প্রেম চুইঝাল নিয়ে।

আজকে যে ব্যাচ টা খেলাম, সেটা হলো স্লো কুকিং গরু, ৮ ঘন্টার স্লো কুকিং। ডিশ এর নাম টা জিজ্ঞাসা করা হয় নি। তবে এটা কিছুটা জান্নাতি খাবার।

শুরুতে যে বলছিলাম, গরুর মাংস আশেপাশের সবকিছুর মজা বাড়িয়ে দেয়, এই মাংস টা এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ।

অপরিচিত কেউ খাওয়ালে ভাবতাম কিছু নেশা জাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে হয়তো ছিনতাই এর পরিকল্পনা চলছে।

তবে শেফ আমার খুব কাছের মানুষ হওয়াতে এ জাতীয় ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হলো।

গত এক সপ্তাহ ধরে ফ্রিজে রেখেই আমি গরুর মাংস টা খেলাম। টেস্ট এ কোন পরিবর্তন আসে নি। প্রতিবার ই কেমন যেনো মজা বেড়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির সূত্র টা কাজে লাগছে না এই যাত্রায়। আস্তে আস্তে স্বাদ এ কমতি আসার কথা খেতে খেতে। কিন্তু আজকে এটার শেষ ব্যাচ খেয়ে মনে হলো, আরো এক সপ্তাহের জন্য অর্ডার দেয়া লাগবে।

জান্নাতি গরুর গোশতের হালকা বর্ণনা :

গরুর মাংস টা দেখতে কিছু টা কলিজা ভুনার মতো। তাই শুরুতেই মন খুশী হয়ে যায় ( কলিজা ভুলা আমার প্রিয়, তাই)। তবে কিছুক্ষণ খাওয়ার পর বোঝা যায় , এটা কলিজা না, নরম কিছু মাংসের ছড়াছড়ি। প্রতিটা মাংসের গায়েই আশ্চর্যজনক ভাবে একই স্বাদের কিছু মাখা মাখা ঝোল থাকে। তাই প্রতি টুকরা খুব সন্তুষ্টি নিয়ে মুখে দেয়া যায়। আগে থেকেই বোঝা যায় যে পরবর্তি লোকমায় স্বাদে পরিবর্তন আসবে না। পরম নির্ভরতায় আয়োজন করে গোশত খাওয়া যায়। মাঝে মাঝে মনে হয়, কেউ বোধহয় খুব পারদর্শিতার সাথে ছোট কোন যন্ত্র দিয়ে গোল মরিচ মেশানো বাটার ঢুকিয়ে দিয়েছে প্রতি টূকরো মাংসের মাঝে। মুখে দিলেই নরম একটা ঝাল স্বাদ ছড়িয়ে যায়। এ ধরণের খাবার খেতে হয় চোখ বন্ধ করে। তবে অফিসে খাচ্ছি বলে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এটা মাথায় রাখলাম, শেফ এর কাছে স্পেশাল এক বাটি চাইবো। যেটা শুধু চোখ বন্ধ করে খাবো। খুব ভালো হয় কোন জঙ্গলে বসে, শীতের রাতে আগুন জালিয়ে ঝি ঝি পোকার শব্দ শূনে শূনে চোখ বন্ধ করে চিবানো গেলে। তবে একা যেতে হবে। এটা একটা স্বর্গীয় টাস্ক হিসাবে গন্য করা যায়।

বিশেষ ডায়েট এ থাকার কারণে আমি ভাত, রুটী বা পরোটা দিয়ে গরুটা টেস্ট করতে পারছি না। যদিও এটা আমার জন্য খুবই সুখবর। আমার ভাত পছন্দ না, আমি সবসময় তাই এমন খাবার খুঁজি যে টা কিনা ভাত বা তথাকথিত কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট ছাড়াই খাওয়া ইচ্ছা জাগে। এটা সেরকম একটা প্রোটিন এর ডিশ। এটার সাথে ভাত খাওয়ার ইচ্ছা জাগে না। এটা অনেকটা এমন খাবার, যেটা একটু পর পর এক টুকরা মুখে নিয়ে আবার কাজে বসতে ইচ্ছা করে। রান্নাঘরে রান্না করে রেখে দিলে ছোট বাচ্চারা যেমন চুরি করে একটা মুখে দেয়, সেরকম।

এই গোশতের সাথে সবজি হিসাবে ফুলকপি, বাধাকপি, পালং শাক, পুই শাক, বেগুন ভর্তা সবই খেয়ে দেখা হয়েছে।

অদ্ভুতভাবে প্রতিটা খাবারই এই গোশতের কারণে অমৃত হয়ে যায়। আঠালো একটা ঝাল আনন্দে মন ভরে যায়।

আমি শশা, টমেটো ও কাচা মরিচ দিয়েও খেয়ে দেখার চেষ্টা করেছি।

আশ্চর্যের বিষয় হলো এই মাংস শশা, টমেটো এমন কি কাঁচা মরিচ এর স্বাদ ও বাড়িয়ে দেয়।

এই মাংসের বিশেষত্ত হচ্ছে , পেট ভরার আগ পর্যন্ত এটা খাওয়ার ইচ্ছা কমবে না। যখন পেটে জায়গা থাকবে না তখনো আসলে খেতে ইচ্ছা করবে। তবে পাকস্থলিতে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে খাওয়া সম্ভব হবেনা , যদিও জিহবার ক্ষুদা টা তখনো থাকবে। শেফ কে বলে মাংস টা আবার রান্না করার ব্যবস্থা করতে হবে। এমন হলো না তো, যে ভুলে কোন স্বর্গীয় পশু জবেহ করা হয়েছে, তাই এমন রহস্যজনক মজা খেতে!

এটা এমন একটা খাবার যে, বড় করে যদি লেখাও থাকে “অপিরিচিত কাহারো থেকে কিছু খাবেন না” তাও খেতে ইচ্ছা করবে।

জীবনটা তচনচ হয়ে গেলো। পরাবাস্তব এই খাবার টার কবলে পড়ে। কিছুক্ষণ পরপরই একটু করে খেতে ইচ্ছা করছে। আমার হাতে বিশেষ ক্ষমতা থাকলে আমি এই গোশতের রেসিপিকে বাংলাদেশের জাতীয় রেসিপি ঘোষণা করে দিতাম। মনে হয় না, এই গোশত খাবার পর এই জীবনে আর অন্য কোন গোশতে এত আবেগপ্রবণ হতে পারবো।

টাইম মেশীন আবিষ্কারের প্রথম ধাপ হবে, টাইম ডায়ালেশান করে ৮ ঘন্টার স্লো কুকিং এ ৫ মিনিটে আনা। তাহলে যখন তখন এটা খাওয়া যাবে।

পোস্টএপোক্যালিপ্টিক ওয়ার্ল্ড এ কোন ধ্বংসাবশেষ এর ভেতর খুঁজে পাওয়া প্রাচীন কোন রেসিপি এটা। যেটা দিয়ে মানব সভ্যতার নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এই রেসিপি যার হাতে থাকবে, তিনিই নতুন সমাজ ব্যবস্থা পরিচালনা করবেন।

গোশতের ব্যাচ শেষ হওয়াটা একটা দুর্যোগ এর মতো মনে হচ্ছে।

তবে আনন্দের খবর হলো শেফ আমার অতি পরিচিত একজন কাছের মানুষ। যতবার বলবো রান্না করতে কখনো মানা করবেন না।

মাংস শেষ হবার দুঃখ টা ভোলার এটাই সান্তনা।


메타데이터
post_id
fdbd48535f8e
slug
মাংস-সমাচার-fdbd48535f8e
url
https://medium.com/@abid.hussain.ayon/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B8-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0-fdbd48535f8e
canonical_url
https://medium.com/@abid.hussain.ayon/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B8-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0-fdbd48535f8e
author_url
https://medium.com/@abid.hussain.ayon
status
ok
fetched_at
2026-06-18 00:10:23